শিরোনাম

 ১/১১ সরকার কর্তৃক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা কারারুদ্ধ গ্রেফতারের পূর্বে হয়তো আমিই শেষ সাক্ষাৎকারী

 

বীরমুক্তিযোদ্ধা কামাল উদ্দিন আহাম্মেদ

মাতা-পিতা-স্বজনহারা শেখ হাসিনা দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হন ২০০৭ সালে। ১/১১ এর বিশেষ তত্ত্বাবধায সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সকাল ৭:৩১-এ যৌথ বাহিনী শেখ হাসিনাকে তার বাসভবন “সুধা সদন” থেকে গ্রেফতার করে। পরবর্তিতে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত তার জামিন আবেদন না-মঞ্জুর করে। শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের জাতীয সংসদের ডেপুটি স্পিকারের বাসভবনকে সাব-জেল হিসেবে ঘোষণা করে সেখানে অন্তরীন করে রাখা হয়।গ্রেফতারের পূর্বে শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা জিল্লুর রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়ীত্ব দিয়ে যান। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুইটি অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। একটি হল ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে রাজনৈতিক সংঘর্ষের জন্য হত্যা মামলা এবং অন্যটি হল প্রায় তিন কোটি টাকার চাঁদাবাজি মামলা। এর মাঝে একটির বাদী ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে মামলাটি তুলে নেন। ৩৩১ দিন কারারুদ্ধ থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ জুন জেল থেকে মুক্তিলাভের পরে তিনি চিকিৎসার্থে কয়েক মাস বিদেশে অবস্থান করেন। এরপর দেশে ফিরে দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেন।

 

শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের পূর্বে শেখ হাসিনার বাসভবন সুধা সদনকে সেনাবাহিনী-র‍্যাব-পুলিশ অবরুদ্ধ করে রাখে,তৎসময়ের ১/১১ সরকারের অনুমতি ছাড়া কেহ শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারতেন না। প্রয়োজনে পুলিশ বক্সের মাধ্যমে টিঠি-পত্র আদান প্রদান করা হতো। এই জটিল সময় শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার লক্ষ্যে আইনজ্ঞ, শুশিল, বুদ্ধিজীবিনামধারী একটি ক্ষমতালিপ্সুমহল সংস্কারের নামে আবির্ভুত হন, এবং সরকারী ও তাদের সমমনা বিভিন্ন মাধ্যমে সংস্কারের পক্ষে ব্যাপক প্রচার চালায়, তাদের সমর্থনে গোপনে কাজ করেন কিছু অতিলোভী আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতির দলের প্রভাবশালী নেতা।

তখন রাজনীতিসহ সব কিছুই সেনা সমর্থিত১/১১ সরকার নিয়ন্ত্রন করতো, ভয়েও কেহ মুখ খুলতে শাহস দেখাতো না,আমার ক্ষুদ্র পরিসরে প্রকাসিত চেতনায় একাত্তর পত্রিকায় বিভিন্নভাবে লেখনীর মাধ্যমে শেখ হাসিনার পক্ষে লেখা চালিয়ে যেতে থাকি। রাজনৈতিক সংস্কার আর মাইনাস ফর্মূলাকে কার্যকর করতে জনমত গঠনে ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়।

আমিও বসে থাকতে পারি নাই, নিজে নিজে একটা পাল্টা সংস্কার প্রস্তাব তৈরী করে ফেললাম সেখানে বলা হলো বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে রেখেই সংস্কার হতে হবে, আওয়ামী লীগের তৃনমূল যতদিন চাইবেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ততদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে  থাকবেন। এর সাথে রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয় আরো কিছু পয়েন্ট জুড়ে দেওয়া হয়। সেই সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গ্রেফতার হওয়ার ২দিন পূর্বে মুন্সিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরি সদস্য হাজি সফিউদ্দিনকে নিয়ে সুধা সদনে চলে যাই। তখন আমি মুন্সিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, তবে চেতনায়  একাত্তর সম্পাদক হিসাবেই আমি পরিচিত হই।

সুধা সদনে যাওয়ার পথে পুলিশ আমাদের আটকায় শেখ হাসিনার নিকট সংস্কার প্রস্তাব জমা দেওয়ার কথা বললে আমাকে যেতে দেয়,সুধা সদনের সামনে পাহাড়ারত পুলিশ আমাকে বসিয়ে সুধা সদনের ভিতর খবর দেয়, কিছুক্ষন পর শেখ হাসিনার তৎসময়ের  পি,এস ড. হাসান মাহমুদ ( সাবেক মন্ত্রি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক) সুধা সদন থেকে এসে আমার কাছ থেকে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আমাকে বসতে বলেন, তিনি সুধা সদনের ভিতরে চলে যান,১০/১৫ মিনিট পরে তিনি এসে সংস্কার পত্র গ্রহন করেন,তখন আমি শেখ হাসিনার সাথে দেখা করার কথা বললে তিনি বলেন আগামীকাল সকাল ১১টার পূর্বে আসেন দেখা করিয়ে দেব তবে ১১টার পর নেত্রী ৩২ নাম্বারে চলে যাবেন,হাসান মাহমুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা চলে আসি,আসার সময় হাসান মাহমুদ তার মুবাইল নাম্বার আমাকে দেন। পরদিন সুধা সদনে যেতে যেতে ১১.৩০ বেজে যায়,খবর পাই নেত্রী ৩২ নাম্বার চলে গেছে, আমি হাসান মাহমুদকে ফোন করি, তিনি দেরী করার রাগ করেন, তিনিবলেন আমি অসুস্থ্য মা-কে দেখতে হাসপাতাল আছি, তিনি একটি মুবাইল নাম্বার দিয়ে বলেন এটা নেত্রীর এ,পি,এস খালেদের নাম্বার খালেদ নেত্রীর সাথে ৩২ নাম্বারে আছে,আপনি ৩২ নাম্বার চলে যান, সেখানে গিয়ে খালেদকে ফোন করবেন,খালেদ নেত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবে,খালেদকে আমি বলে দিচ্ছি, তারাতারি চলে যান, আমরা ৩২ নাম্বারে গিয়ে খালেদকে ফোন করিলে খালেদ বলে আপনারা ২টি টিকেট কেটে ভেতরে প্রবেশ করেন, আমরা টিকেট কেটে ভেতরে প্রবেশ করি, খালেদকে ফোন করি, খালেদ এসে আমাদের নিয়ে সরাসরি নেত্রীর রুমে ডুকিয়ে দেন, সিড়ির পূর্ব পাশে নেত্রীর ব্যক্তিগত অফিস রুম, মাঝারী আকারের প্রায় ৫ফিট বাই ১০/১২ ফিট টেবিল, টেবিলের উত্তর পাশে নেত্রী বসা, বঙ্গবন্ধু যাদুঘরের ফাইল দেখছেন, সারা বাড়িটা আর্মি – পুলিশ আর র‌্যাবে ভর্তি, দরজার পাশে আর্মি খালেদকে আমাদের বিষয় জানতে চাইলে, খালেদ বললো এরাই নেত্রী দেশের লোক, আমরা রুমের ভিতর ডুকে প্রিয় নেত্রীকে সালাম দেই,নেত্রী সালাম গ্রহন করে তার পাশে আমাদের দুইজনকে বসতে বলেন, নেত্রী ফাইল দেখছেন আর আমাদের সাথে কথা বলছেন, সাধারন সুতি সাড়ি পরিহিত নেত্রৗ কপালের সামনের সাদা পাকা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে, আমাদের থেকে একটু দূরে টেবিলের অপর পাশে লেখিকা সেলিনা রহমান বসা,  আরো একটু পিছনে লতিফ ছিদ্দিকী বসা, অনেক টুকটাক কথার মাঝে সংস্কার প্রস্তাব বিষয় কিছু না বলে নেত্রী শুধু বললেন এই ভাবেই চালিয়ে যান, আবার পরক্ষনেই বললেন বঙ্গবন্ধু যাদুঘরের বরাদ্ধ নাকি সরকার বন্ধ করে দিবে, আমি বলছি আমরা দুই বোন বাড়ি দিয়েছি জাতির জনকের স্থৃতি ধরে রাখার জন্য যাদুঘর করেছি, সরকার বরাদ্ধ বন্ধ করে দিলে, আমি বলছি সারা দেশের ১(এক) কোটি আওয়ামী লীগ সমর্থক বঙ্গবন্ধু প্রেমিক প্রতি মাসে এক টাকা করেও যদি বঙ্গবন্ধু যাদুঘরে দেন, সরকারী বরাদ্ধ ছাড়াই বঙ্গবন্ধু যাদুঘর ভালভাবে চলবে,কিছুক্ষন থেমে আবার বললেন আপনারাও যখন যেইভাবে পারেন এই যাদুঘরের জন্য কাজ করুন। তিনি বঙ্গবন্ধু যাদুঘরের পরিচালক বজলুর রহমানকে ডেকে বললেন ওনারা আসলে তাদের প্রতি খেয়াল রাখবেন, বজলুর রহমান সাহেব আমাদের ভিজিটিং কার্ড দেন,  এরই মধ্যে জোহরের আযান হয়, নেত্রী বাসায় ফেরার প্রস্ততি নেন, তার সিকিউরিটিকে এলার্ড করা হয়, নেত্রী আমাদের বললেন আপনারা বসেন, আমি চলে যাওয়ার পর আপনারা যাবেন,এরই মধ্যে সাইরেন, বাসিঁ বাজাতে শুরু করলো, নেত্রী চলে গেল, প্রায় ৩৫ মিনিট নেত্রীর পাশে বসে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম,  রুম থেকে বাহির হয়ে লনে বিছানো জানামাজে জোহরের নামাজ আদায় করে নিলাম,বঙ্গবন্ধু,বঙ্গমাতা. বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকলের জন্য দোয়া করলাম, খালেদের পরামর্শমতে বেশী দেরী না করে চলে আসি, পরের দিন ১৬ই জুলাই  শুনতে পারলাম শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মনের ভেতরটা যেন মুচড়ে উঠলো, নিরব নিথর দেহে কিছুক্ষন একাকী বসে ছিলাম,চিৎকার করে কাঁদতে পারি নাই, তবে গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়েছে। আমার প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘজীবন ও সুস্থ্যতা কামনা করছি।

সম্পাদক, চেতনায় একাত্তর

Be the first to comment on " ১/১১ সরকার কর্তৃক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা কারারুদ্ধ গ্রেফতারের পূর্বে হয়তো আমিই শেষ সাক্ষাৎকারী"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*